Thursday , 4 June 2020

১৫০ টাকার মজুরিতে খেটে, আজ WBCS A গ্রেড অফিসার

নুন আনতে পান্তা ফুরনো-র সংসার। অনটন নিত্য সঙ্গী। হাল ছাড়েননি। পরিশ্রমে জোর দিয়েছেন আরও। ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। ডব্লিউবিসিএস ২০১৬ এগজ়িকিউটিভ পরীক্ষায় চূড়ান্ত বাছাইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন শান্তনু সিংহ ঠাকুর। এখন তিনি এ গ্রেড অফিসার। বাঁকুড়ার তিলাবেদ্যা গ্রামের বাসিন্দা শান্তনু।

খড়ের চালের দু-কামরার বাড়িতে বাবা-মা আর দিদিকে নিয়ে সংসার। নিত্য ভাত জোটাতেই হিমশিম অবস্থা। তারওপর উচ্চশিক্ষার খরচ! দমে যাননি শান্তনু। প্রাইভেট টিউশন পড়িয়েছেন। ব্লক অফিসে দৈনিক ১৫০ টাকা মজুরিতে ফাই ফরমাশ খেটেছেন। আর চালিয়ে গিয়েছেন নিজের পড়াশোনা।

শান্তনু বললেন;ইংরেজি, বিজ্ঞানে টিউশন নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আর্থিক পরিস্থিতির জন্য পারিনি। তাতে কী? নিজে পড়েই মাধ্যমিকে ৭৮.২৫ শতাংশ নাম্বার পেয়েছেন। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন কলা বিভাগে। অনেকে নাক কুঁচকেছিলেন। আর্টস নিয়ে পড়ে কী হবে? ; গোছের মন্তব্যও শুনতে হয়েছে। পাত্তা দেননি শান্তনু।

সেইসময় রোজ সাইকেল চালিয়ে বাঁকুড়া শহরে যেতেন। টিউশন পড়ানো, ছোটখাটো কাজ। পাছে বাড়ির লোক কষ্ট পান – জানাননি কিছু। ৮৫ শতাংশ নাম্বার নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ২০১৩ সালে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পাশ করেন বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে। শক্তপোক্ত ভিত তৈরি ছিলই। শুধু দিশা পাচ্ছিল না।

শান্তনুর কথায়, ;ছোটোবেলায় প্রপার গাইডেন্স পাইনি। পরিশ্রম সবাই কম বেশি করে। কিন্তু, গাইডেন্সের অভাবে অনেকে বেশি পরিশ্রম করেও সঠিক জায়গায় যেতে পারে না। এ ব্যাপারে নিজেকে কিছুটা হলেও ভাগ্যবান মনে করেন। তিনি পেয়েছেন জামাইবাবু শুভ্রকান্তি সিংহকে। নিজের সাফল্যের পেছনে ওই মানুষটিকে “ভগবানের” মতো মনে করেন শান্তনু।

বেহাল সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি শান্তনুকে জীবনে সফল হওয়ার পথটাও চিনিয়েছেন তিনি। তাই জামাইবাবু শুভ্রকান্তি সিংহ, ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বারবার ফিরে আসে তাঁর কথায়। হাসতে হাসতে শান্তনু বললেন, ওই দিন থেকেই ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম।

আর আমার জীবনের সবকিছুর সব সাফল্যের নেপথ্যে আছেন জামাইবাবু। ওঁর ঋণ শোধ করা যাবে না।দরিদ্র পরিবার বলে কোনোরকম হীনমন্যতা ছিল না তাঁর। স্ট্রাগল করে বড় হতে হয়েছে বলে আক্ষেপও নেই কোনও। বরং এজন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। এটারও ইতিবাচক দিক আছে; শান্তনুর ব্যাখ্যা, স্ট্রাগল পিরিয়ডটা আমার কাছে লার্নিং পিরিয়ড।

স্ট্রাগল স্টোরি সবার জীবনে কমবেশি থাকে। আমার জীবনে হয়তো একটু বেশি। ট্রাগল স্টোরি না বলে আমি এটাকে জীবনের লার্নিং প্রসেস বলব। আমাকে অনেক শিখিয়েছে যেটা। আর্থিক সমস্যার মতো বিষয়গুলো ধীরে ধীরে মনের মধ্যে একটা টাফনেস তৈরি করে দিয়েছে। যদি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাতাম, এই কনসেপ্টটা হয়ত ডেভলপ করত না।

একটা বই আমাকে যতটা না শিখিয়েছে, দৈনিক এই লড়াইটা অনেককিছু শিখিয়েছে। ডব্লিউবিসিএস অফিসার হয়েও শান্তনুর পা মাটিতে। বললেন, কষ্ট করেছি। এবার মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। এটা আমার কাছে শুধু চাকরি নয়, মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ। সেটা কাজে লাগাতে চাই।

আগামী দিনে যারা ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় বসবেন তাঁদের জন্য শান্তনুর টিপস, যে কোনও বিষয়কে গভীরভাবে বোঝা দরকার। সমসাময়িক বিষয়ের ওপর ঞ্জান থাকাটাও জরুরী। তবে অ্যাকাডেমিকসের প্রভাব ডব্লিউবিসিএস-এ বেশি পড়ে না। এখন শুধু নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিনটার কথা ভাবছেন শান্তনু সিংহঠাকুর।

Check Also

ঘরের ইঁদুরের যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি দেবে পেঁয়াজ, দেখুন বিস্তারিত

ইঁদুর মানেই যন্ত্রণার আরেক নাম। কাপড়, কাগজ কেটে একাকার করে ইঁদুর। এতে অনেক ক্ষতি যেমন ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!