মূত্রনালীর সংক্রমণ এর ক্ষেত্রে যে ৪ টি ভুল এড়িয়ে চলা উচিৎ

মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া, শ্রোণী অঞ্চলে ব্যথা হওয়া সহ আরো অনেক উপসর্গ দেখা দেয়। নির্দিষ্ট কিছু কাজের ফলে এর উপসর্গ আরো খারাপ হয়। মোম্বাই এর ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ ডা. অরুন্ধতী ধর এর মতে ইউটিআই এর সমস্যা থাকলে যে ভুলগুলো করা ঠিক নয় সে বিষয়গুলো জেনে নিই চলুন।

১. পানি পান না করা: ঘন ঘন মূত্র ত্যাগের ফলে শরীরের পানির পরিমাণ কমে যায় বলে মুত্রাশয়ে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই নিয়মিত পানি পান করা উচিৎ। নিয়মিত পানি পান করা ও প্রস্রাব করার ফলে মূত্রনালীর প্রাচীর পরিষ্কার হতে সাহায্য করে।

২. প্রস্রাব আটকে রাখা: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে আপনার মূত্রনালীতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রস্রাব বেশীক্ষণ আটকে রাখলে জীবাণুরাও মূত্রাশয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ভাসতে থাকে। তাই বেশীক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা ঠিক নয়।

৩. নিজে নিজেই ঔষধ গ্রহণ করা: ইউটিআই এর সমস্যা দেখা দিলে যদি আপনি নিজে নিজেই ঔষধ গ্রহণ করা শুরু করে দেন তাহলে আপনি আপনার সমস্যাটিকে বাড়িয়ে তুলবেন। চিকিৎসা শুরু না করে অপেক্ষা করে বসে থাকলে মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে তীব্র কিডনি ইনফেকশন হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে গেলে কোমরে ব্যথা, জ্বর ও বমি হওয়ার মত উপসর্গগুলো দেখা দেয়।

৪. অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেয়া: আপনি হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকের দুটি ডোজ খাওয়ার পরেই সুস্থ অনুভব করতে পারেন কিন্তু যদি পুরো কোর্স সম্পন্ন না করেন তাহলে ঔষধের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তৈরি করবে। অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করাটাও অর্থহীন হবে। এজন্যই অ্যান্টিবায়োটিক এর কোর্সের মেয়াদ পুরোপুরি শেষ না করে মাঝ পথে ছেড়ে দেয়া বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই বিরতি দিয়ে পুনরায় খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। [১]

ইউটিআই রোগের কারণ ও লক্ষণ: ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই একটি সাধারণ রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন দেশের খ্যাতনামা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক।

প্রশ্ন : ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই বিষয়টি কী?

উত্তর : ইউরিনারি ট্র্যাক্ট মানে হলো যে রাস্তা দিয়ে প্রস্রাব বের হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, কিডনি প্রস্রাব তৈরি করে। তার পর কিডনি থেকে ইউরেটার নল দিয়ে ইউরিনারি ব্লাডারে প্রস্রাবটা আসে। এর পর প্রস্রাব ইউরিথ্রা দিয়ে বের হচ্ছে। এই পুরো জায়গাটা, অর্থাৎ ইউরেটার থেকে শুরু করে ইউরিথ্রা পর্যন্ত এই পুরো ট্র্যাক্টটাকে ইউরিন ট্র্যাক্ট বলি। এই জায়গাটার কোনো অংশে যদি সংক্রমণ হয়, তাকে ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বলা হয়।

প্রশ্ন : একজন মানুষ সাধারণত ইউটিআইতে আক্রান্ত হন কেন?

উত্তর : ইউটিআইয়ে আক্রান্ত হওয়ার কারণ কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। আর কিছু রয়েছে হোস্ট ফেক্টর, অর্থাৎ ওই লোকটার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। অথবা তাঁর ইউরিনারি ট্র্যাক্টের কোনো সমস্যা আছে। এটা একটা সংক্রমণ তৈরি করতে পারে। কাজেই ফ্যাক্টর দুটো। যিনি রোগী তাঁরও কিছু ফ্যাক্টর থাকবে। আরেকটি হলো জীবাণু থেকে সংক্রমণ।

প্রশ্ন : এর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা নারী-পুরুষভেদে কোনো বিষয় আছে কি?

উত্তর : ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা খুব বড় একটি বিষয় এ ক্ষেত্রে। ধর্মীয় মতে বলা আছে, প্রস্রাব করার পর ভালোভাবে পরিষ্কার করার কথা। পরিষ্কারের বিষয়টি ভালোভাবে মেনে চলতে হবে। আর মেয়েদের বেলায় ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন খুব বেশি হচ্ছে। কারণ, মেয়েদের পায়খানার রাস্তা এবং প্রস্রাবের রাস্তাটা খুব কাছাকাছি থাকে, তাই এটা বেশি হয়। আরেকটি কারণে হয়, আমাদের দেশে মেয়েরা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব ধরে রাখে। তারা হয়তো বাইরে গেল তখন প্রস্রাবের কোনো ভালো জায়গা পায় না। প্রস্রাব করার সুযোগ পায় না। এটাও এ রোগ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

প্রশ্ন : নিয়মিত প্রয়োজনমতো পানি না খাওয়া কি ইউটিআই হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে কি না?

উত্তর : আপনি জেনে থাকবেন, আমরা কিছু কিছু কিডনি রোগের ক্ষেত্রে পানি কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। আবার কিছু কিডনি রোগে বলি পানি বেশি খাবেন। ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে আমরা বলি পানি বেশি খেতে, যাতে প্রস্রাব বেশি করে হয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো বের হয়ে যায়।

প্রশ্ন : একজন মানুষ যদি ইউটিআইতে আক্রান্ত হন, সে ক্ষেত্রে তাঁর কী ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

উত্তর : শুরুতে দেখা যায়, তাঁর প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হচ্ছে। কখনো লাল প্রস্রাব হতে পারে। প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। তার পর জ্বর শুরু হতে পারে। ভীষণ কাঁপুনি দিয়ে এই জ্বর আসবে। এই লক্ষণ যদি কারো ক্ষেত্রে হয়, তবে আমরা ধরেই নেব এটা ইউটিআই।

প্রশ্ন : এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আপনারা কী করেন?

উত্তর : এ রকম লক্ষণ নিয়ে আসলে আমরা প্রস্রাবটা পরীক্ষা করি এবং কালচার সেনসিটিভিটি দিই। কালচার মানে হলো, ব্যাকটেরিয়াকে কালচার করে আমরা দেখতে পারি কোন ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে রোগী আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি সেনসিটিভিটি বা স্পর্শকাতরতা পরীক্ষা করি। সেনসিটিভিটির মাধ্যমে দেখি কোন ওষুধ এখানে কাজ করবে। ইউটিআই আসলে খুব সাধারণ অসুখ। তবে সময়মতো যদি অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া হয়, তাহলে এর থেকে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

প্রশ্ন : আমাদের মধ্যে অনেকেরই অভ্যাস রয়েছে, না বুঝে হোক বা গাফিলতির জন্য হোক, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর সেটা নিয়মিত না করা। ইউটিআইর ক্ষেত্রে যদি একজন রোগীকে ওষুধ দিলেন, কিছুদিন পর সে ভালো হয়ে গেছে মনে করল এবং ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিল—কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : এতে খুব ক্ষতি হবে। আমরা ৭ থেকে ১৪ দিন একটি অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দিই। ইউটিআই এমন একটি বিষয়, দুদিন ওষুধ খেলে দেখবেন তার কোনো লক্ষণ থাকবে না। তখনই অনেক সময় সে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে যখন তার ইউটিআই হবে দেখা যাবে, ওই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না তার ক্ষেত্রে। এমনও দেখা গেছে, প্রায় ১৬ থেকে ২০টা অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসটেন্স হয়ে গেছে। এর কারণ হলো আমরা যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি এবং সময়মতো করি না। সে জন্য ওষুধ আর কাজ করছে না।

প্রশ্ন : কেউ ইউটিআই রোগে আক্রান্ত হলে যদি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না নেয়, তাহলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : আমরা জানি, ক্রনিক কিডনি রোগের একটি বড় কারণ বার বার ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হওয়া। ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, সেখান থেকে কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। একবার যদি এমন অবস্থা হয়ে যায়, তাহলে সে শেষ পর্যায়ে চলে যাবে, ডায়ালাইসিস লাগবে। কাজেই সাধারণ মনে হলেও ইউটিআই সাধারণ নয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটা অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় চলে যেতে পারে।

প্রশ্ন : ইউটিআই প্রতিরোধে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : প্রস্রাব বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না। প্রস্রাব করতে হবে ঠিকমতো। কখনো যদি এই রোগের চিকৎসা করেন, তবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করতে হবে। সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং কোর্স পূর্ণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।

প্রশ্ন : আপনি বলছিলেন, ইউটিআই পরীক্ষার সময় কালচার সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। যদি না করা হয় তাহলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর : এটা করা ভালো। ধরুন, একজন রোগী আমাদের কাছে এলো, আমরা একটি অ্যান্টিবায়োটিক তাকে দিয়ে দিই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলি, অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন ইউরিন কালচার করতে দিয়ে। এই ফলাফল আসে তিন দিনের মধ্যে। তখন দেখি, ওই কালচারে কোন অ্যান্টিবায়োটিকটা স্পর্শকাতর। যদি দেখি যেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে, সেটিই স্পর্শকাতর হচ্ছে বা সাড়া দিচ্ছে, কাজ করছে তবে সেটাই চলবে।

প্রশ্ন : ইউটিআই হলে আপনারা বলেন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে। এই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান মানে কী? আর এই রোজার সময় তো অনেকের পানি পান করা কমে যায়। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : রোজার সময় পানি পানের চাহিদাটা বেড়ে যায়। তাই ইফতারের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত পানি ভালোভাবে খেয়ে নেবেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের গড়ে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করলে চলবে।

প্রশ্ন : আর যদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হোন তাঁদের বেলায়?

উত্তর : যতটুকু প্রস্রাব হবে তার থেকে আধা লিটার বেশি পানি পান করবে। অথবা চিকিৎসকের পরামর্শমতো পানি পান করবেন।[২]

মেয়েদের রিকারেন্ট ইউটিআই বা বারবার প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ

মেয়েদের যে সমস্ত কমন অসুখ-বিসুখ হয় তার মধ্যে ইউটিআই বা প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ অন্যতম। এমন নারী বোধহয় পাওয়া যাবে না যার পুরো জীবনে অন্তত একবার এ সমস্যা হয়নি। অনেকের একবার ইউটিআই হলে বার বার হওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। বছরে তিনবার বা এর বেশি প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে একে বলা হয় রিকারেন্ট ইউটিআই এবং তা হতে পারে একই জীবাণু অথবা নতুন কোন জীবাণু দ্বারা।

সাধারণভাবে পুরুষের চেয়ে নারীর প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ বেশি হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, মেয়েদের মূত্রনালীর দৈর্ঘ্য কম এবং এর মুখের অবস্থান যোনিপথ এবং মলদ্বারের কাছাকাছি। এ দু’টি স্থানে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর জীবাণুু থাকে, আর খুব সহজেই সেখান থেকে জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে।

স্বাভাবিকের চেয়ে কম পরিমাণে পানি পান, দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা, অপরিচ্ছন্ন থাকা, নোংরা পানি ব্যবহার, যৌনমিলনের আগে ও পরে প্রস্রাব না করা বা পরিচ্ছন্ন না হয়েই ঘুমিয়ে পড়া এসব বিষয় প্রস্র্রাবে জীবাণুু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রে মূত্র নির্গমণের পর পানি দিয়ে পরিষ্কারের সময় বার বার হাত মূত্রনালীর মুখ থেকে মলদ্বার ছুঁয়ে আবার মূত্রনালীর মুখ স্পর্শ করার কারণে এবং মেয়েদের এস্ট্রোজেন হরমোনজনিত সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার জন্য ঘনঘন ইউটিআই হতে পারে। যোনিপথে যৌনবাহিত রোগ সংক্রমণের সাথে প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণের যোগ রয়েছে এবং অনেক সময় যৌনবাহিত রোগ হলে তাকে ইউটিআই মনে করে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন।

যাদের বার বার ইউটিআই হয় তাদের মূত্রতন্ত্রের গঠনগত কোন সমস্যা আছে কিনা তা দেখে নেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও মূত্রতন্ত্রের কোথাও পাথর আছে কিনা সেটা জানাও জরুরী। মেনপজ বা স্থায়ী ঋতু বন্ধ হলে এস্ট্রোজেন হরমোনের অভাবে যোনিপথ ও মূত্রতন্ত্রের স্বাভাবিক সুরক্ষা কমে যায়। পানি খাওযার পরিমাণও হ্রাস পায়। তাছাড়া বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকার কারণেও মেনপজ পরবর্তী নারীদের বার বার ইউটিআই হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী কোন অসুখের জন্য স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।

প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে ঘনঘন প্রস্র্রাবের বেগ, তাড়না, মূত্রনালীতে জ্বালা, তলপেটে অস্বস্তি থেকে শুরু করে প্রচ- ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়া প্রস্রাব ঘোলা হতে পারে অথবা প্রস্র্রাবে রক্তও যেতে পারে। চিকিৎসা সঠিক সময়ে না হলে মূত্রতন্ত্রের উপরি অংশে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তখন রোগীর কাঁপানো জ্বর এবং কোমরে ব্যথার উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ অবস্থা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।

ইউটিআই বা প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রস্র্রাব পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে।

বার বার প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণরোধে করণীয় হলো :

ক. প্রস্র্রাবের বেগ চেপে না রেখে প্রস্র্রাব করে ফেলতে হবে।

খ. প্রস্র্রাব করার পর টয়লেট পেপার দিয়ে চেপে মুছতে হবে, কখন্র ঘষবেন না এবং পায়খানার রাস্তা থেকে প্রস্র্রাবের রাস্তার দিকে কখনও মুছবেন না।

গ. পরিমিত পানি পান করতে হবে। গরমের সময় শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে কয়েক গ্লাস পানি বেশি খেতে হবে। এ ক্ষেত্রে লেবুর শরবত, অন্যান্য ফলের রস, ডাব ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

ঘ. কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলতে হবে। যাদের এ সমস্যা রয়েছে তারা প্রচুর পানি পানের পাশাপাশি আঁশযুক্ত খাবার যেমন, শাক-সব্জি, সালাদ, ফল, ইসবগুলের ভুসি ইত্যাদি বেশি করে খাবেন। তবে ইসবগুলের ভুসি ভিজিয়ে না রেখে সাথে সাথে খাবেন।

ঙ. গরমের দিনে তাজা দই খেতে পারেন।

চ. যৌনমিলনের আগে পানি খেয়ে নিন এবং আগে ও পরে প্রস্র্রাব করে পরিষ্কার হয়ে নেবেন।

ছ. যৌনমিলনে শুষ্কতা এড়াতে কে-ওয়াই জেলি ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুক্রাণু নাশক কোন ওষুধ ব্যবহার করবেন না।

জ. মাসিক বা রজঃস্রাবের সময় যৌনমিলন করবেন না। ইউটিআই প্রতিরোধের পাশাপশি তা যৌনবাহিত রোগ এড়াতে সহায়ক হবে।

ঝ. যাদের মেনপজ হয়ে গেছে তাদের বার বার ইউটিআই বা প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যোনিপথে এবং মূত্রনালীর মুখে এস্ট্রোজেন ক্রিম ব্যবহার করতে হতে পারে।

ঞ. রিকারেন্ট ইউটিআই-এর ক্ষেত্রে স্বল্প মাত্রায় দীর্ঘদিন এ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হতে পারে।

মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া, শ্রোণী অঞ্চলে ব্যথা হওয়া সহ আরো অনেক উপসর্গ দেখা দেয়। নির্দিষ্ট কিছু কাজের ফলে এর উপসর্গ আরো খারাপ হয়। মোম্বাই এর ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ ডা. অরুন্ধতী ধর এর মতে ইউটিআই এর সমস্যা থাকলে যে ভুলগুলো করা ঠিক নয় সে বিষয়গুলো জেনে নিই চলুন।

১. পানি পান না করা: ঘন ঘন মূত্র ত্যাগের ফলে শরীরের পানির পরিমাণ কমে যায় বলে মুত্রাশয়ে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই নিয়মিত পানি পান করা উচিৎ। নিয়মিত পানি পান করা ও প্রস্রাব করার ফলে মূত্রনালীর প্রাচীর পরিষ্কার হতে সাহায্য করে।

২. প্রস্রাব আটকে রাখা: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে আপনার মূত্রনালীতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রস্রাব বেশীক্ষণ আটকে রাখলে জীবাণুরাও মূত্রাশয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ভাসতে থাকে। তাই বেশীক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা ঠিক নয়।

৩. নিজে নিজেই ঔষধ গ্রহণ করা: ইউটিআই এর সমস্যা দেখা দিলে যদি আপনি নিজে নিজেই ঔষধ গ্রহণ করা শুরু করে দেন তাহলে আপনি আপনার সমস্যাটিকে বাড়িয়ে তুলবেন। চিকিৎসা শুরু না করে অপেক্ষা করে বসে থাকলে মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে তীব্র কিডনি ইনফেকশন হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে গেলে কোমরে ব্যথা, জ্বর ও বমি হওয়ার মত উপসর্গগুলো দেখা দেয়।

৪. অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেয়া: আপনি হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকের দুটি ডোজ খাওয়ার পরেই সুস্থ অনুভব করতে পারেন কিন্তু যদি পুরো কোর্স সম্পন্ন না করেন তাহলে ঔষধের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তৈরি করবে। অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করাটাও অর্থহীন হবে। এজন্যই অ্যান্টিবায়োটিক এর কোর্সের মেয়াদ পুরোপুরি শেষ না করে মাঝ পথে ছেড়ে দেয়া বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই বিরতি দিয়ে পুনরায় খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। [১]

ইউটিআই রোগের কারণ ও লক্ষণ

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই একটি সাধারণ রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন দেশের খ্যাতনামা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক।

প্রশ্ন : ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই বিষয়টি কী?

উত্তর : ইউরিনারি ট্র্যাক্ট মানে হলো যে রাস্তা দিয়ে প্রস্রাব বের হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, কিডনি প্রস্রাব তৈরি করে। তার পর কিডনি থেকে ইউরেটার নল দিয়ে ইউরিনারি ব্লাডারে প্রস্রাবটা আসে। এর পর প্রস্রাব ইউরিথ্রা দিয়ে বের হচ্ছে। এই পুরো জায়গাটা, অর্থাৎ ইউরেটার থেকে শুরু করে ইউরিথ্রা পর্যন্ত এই পুরো ট্র্যাক্টটাকে ইউরিন ট্র্যাক্ট বলি। এই জায়গাটার কোনো অংশে যদি সংক্রমণ হয়, তাকে ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বলা হয়।

প্রশ্ন : একজন মানুষ সাধারণত ইউটিআইতে আক্রান্ত হন কেন?

উত্তর : ইউটিআইয়ে আক্রান্ত হওয়ার কারণ কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। আর কিছু রয়েছে হোস্ট ফেক্টর, অর্থাৎ ওই লোকটার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। অথবা তাঁর ইউরিনারি ট্র্যাক্টের কোনো সমস্যা আছে। এটা একটা সংক্রমণ তৈরি করতে পারে। কাজেই ফ্যাক্টর দুটো। যিনি রোগী তাঁরও কিছু ফ্যাক্টর থাকবে। আরেকটি হলো জীবাণু থেকে সংক্রমণ।

প্রশ্ন : এর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা নারী-পুরুষভেদে কোনো বিষয় আছে কি?

উত্তর : ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা খুব বড় একটি বিষয় এ ক্ষেত্রে। ধর্মীয় মতে বলা আছে, প্রস্রাব করার পর ভালোভাবে পরিষ্কার করার কথা। পরিষ্কারের বিষয়টি ভালোভাবে মেনে চলতে হবে। আর মেয়েদের বেলায় ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন খুব বেশি হচ্ছে। কারণ, মেয়েদের পায়খানার রাস্তা এবং প্রস্রাবের রাস্তাটা খুব কাছাকাছি থাকে, তাই এটা বেশি হয়। আরেকটি কারণে হয়, আমাদের দেশে মেয়েরা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব ধরে রাখে। তারা হয়তো বাইরে গেল তখন প্রস্রাবের কোনো ভালো জায়গা পায় না। প্রস্রাব করার সুযোগ পায় না। এটাও এ রোগ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

প্রশ্ন : নিয়মিত প্রয়োজনমতো পানি না খাওয়া কি ইউটিআই হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে কি না?

উত্তর : আপনি জেনে থাকবেন, আমরা কিছু কিছু কিডনি রোগের ক্ষেত্রে পানি কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। আবার কিছু কিডনি রোগে বলি পানি বেশি খাবেন। ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে আমরা বলি পানি বেশি খেতে, যাতে প্রস্রাব বেশি করে হয়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো বের হয়ে যায়।

প্রশ্ন : একজন মানুষ যদি ইউটিআইতে আক্রান্ত হন, সে ক্ষেত্রে তাঁর কী ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

উত্তর : শুরুতে দেখা যায়, তাঁর প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হচ্ছে। কখনো লাল প্রস্রাব হতে পারে। প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। তার পর জ্বর শুরু হতে পারে। ভীষণ কাঁপুনি দিয়ে এই জ্বর আসবে। এই লক্ষণ যদি কারো ক্ষেত্রে হয়, তবে আমরা ধরেই নেব এটা ইউটিআই।

প্রশ্ন : এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আপনারা কী করেন?

উত্তর : এ রকম লক্ষণ নিয়ে আসলে আমরা প্রস্রাবটা পরীক্ষা করি এবং কালচার সেনসিটিভিটি দিই। কালচার মানে হলো, ব্যাকটেরিয়াকে কালচার করে আমরা দেখতে পারি কোন ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে রোগী আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি সেনসিটিভিটি বা স্পর্শকাতরতা পরীক্ষা করি। সেনসিটিভিটির মাধ্যমে দেখি কোন ওষুধ এখানে কাজ করবে। ইউটিআই আসলে খুব সাধারণ অসুখ। তবে সময়মতো যদি অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া হয়, তাহলে এর থেকে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

প্রশ্ন : আমাদের মধ্যে অনেকেরই অভ্যাস রয়েছে, না বুঝে হোক বা গাফিলতির জন্য হোক, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর সেটা নিয়মিত না করা। ইউটিআইর ক্ষেত্রে যদি একজন রোগীকে ওষুধ দিলেন, কিছুদিন পর সে ভালো হয়ে গেছে মনে করল এবং ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিল—কী সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : এতে খুব ক্ষতি হবে। আমরা ৭ থেকে ১৪ দিন একটি অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দিই। ইউটিআই এমন একটি বিষয়, দুদিন ওষুধ খেলে দেখবেন তার কোনো লক্ষণ থাকবে না। তখনই অনেক সময় সে ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে যখন তার ইউটিআই হবে দেখা যাবে, ওই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না তার ক্ষেত্রে। এমনও দেখা গেছে, প্রায় ১৬ থেকে ২০টা অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসটেন্স হয়ে গেছে। এর কারণ হলো আমরা যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি এবং সময়মতো করি না। সে জন্য ওষুধ আর কাজ করছে না।

প্রশ্ন : কেউ ইউটিআই রোগে আক্রান্ত হলে যদি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না নেয়, তাহলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

উত্তর : আমরা জানি, ক্রনিক কিডনি রোগের একটি বড় কারণ বার বার ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হওয়া। ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, সেখান থেকে কিডনি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। একবার যদি এমন অবস্থা হয়ে যায়, তাহলে সে শেষ পর্যায়ে চলে যাবে, ডায়ালাইসিস লাগবে। কাজেই সাধারণ মনে হলেও ইউটিআই সাধারণ নয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটা অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় চলে যেতে পারে।

প্রশ্ন : ইউটিআই প্রতিরোধে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : প্রস্রাব বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না। প্রস্রাব করতে হবে ঠিকমতো। কখনো যদি এই রোগের চিকৎসা করেন, তবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করতে হবে। সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং কোর্স পূর্ণ করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।

প্রশ্ন : আপনি বলছিলেন, ইউটিআই পরীক্ষার সময় কালচার সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। যদি না করা হয় তাহলে কি কোনো ক্ষতি হতে পারে?

উত্তর : এটা করা ভালো। ধরুন, একজন রোগী আমাদের কাছে এলো, আমরা একটি অ্যান্টিবায়োটিক তাকে দিয়ে দিই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলি, অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন ইউরিন কালচার করতে দিয়ে। এই ফলাফল আসে তিন দিনের মধ্যে। তখন দেখি, ওই কালচারে কোন অ্যান্টিবায়োটিকটা স্পর্শকাতর। যদি দেখি যেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে, সেটিই স্পর্শকাতর হচ্ছে বা সাড়া দিচ্ছে, কাজ করছে তবে সেটাই চলবে।

প্রশ্ন : ইউটিআই হলে আপনারা বলেন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে। এই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান মানে কী? আর এই রোজার সময় তো অনেকের পানি পান করা কমে যায়। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : রোজার সময় পানি পানের চাহিদাটা বেড়ে যায়। তাই ইফতারের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত পানি ভালোভাবে খেয়ে নেবেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের গড়ে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করলে চলবে।

প্রশ্ন : আর যদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হোন তাঁদের বেলায়?

উত্তর : যতটুকু প্রস্রাব হবে তার থেকে আধা লিটার বেশি পানি পান করবে। অথবা চিকিৎসকের পরামর্শমতো পানি পান করবেন।[২]

মেয়েদের রিকারেন্ট ইউটিআই বা বারবার প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ

মেয়েদের যে সমস্ত কমন অসুখ-বিসুখ হয় তার মধ্যে ইউটিআই বা প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ অন্যতম। এমন নারী বোধহয় পাওয়া যাবে না যার পুরো জীবনে অন্তত একবার এ সমস্যা হয়নি। অনেকের একবার ইউটিআই হলে বার বার হওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। বছরে তিনবার বা এর বেশি প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে একে বলা হয় রিকারেন্ট ইউটিআই এবং তা হতে পারে একই জীবাণু অথবা নতুন কোন জীবাণু দ্বারা।

সাধারণভাবে পুরুষের চেয়ে নারীর প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ বেশি হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, মেয়েদের মূত্রনালীর দৈর্ঘ্য কম এবং এর মুখের অবস্থান যোনিপথ এবং মলদ্বারের কাছাকাছি। এ দু’টি স্থানে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর জীবাণুু থাকে, আর খুব সহজেই সেখান থেকে জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে।

স্বাভাবিকের চেয়ে কম পরিমাণে পানি পান, দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা, অপরিচ্ছন্ন থাকা, নোংরা পানি ব্যবহার, যৌনমিলনের আগে ও পরে প্রস্রাব না করা বা পরিচ্ছন্ন না হয়েই ঘুমিয়ে পড়া এসব বিষয় প্রস্র্রাবে জীবাণুু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ছোট মেয়েদের ক্ষেত্রে মূত্র নির্গমণের পর পানি দিয়ে পরিষ্কারের সময় বার বার হাত মূত্রনালীর মুখ থেকে মলদ্বার ছুঁয়ে আবার মূত্রনালীর মুখ স্পর্শ করার কারণে এবং মেয়েদের এস্ট্রোজেন হরমোনজনিত সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার জন্য ঘনঘন ইউটিআই হতে পারে। যোনিপথে যৌনবাহিত রোগ সংক্রমণের সাথে প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণের যোগ রয়েছে এবং অনেক সময় যৌনবাহিত রোগ হলে তাকে ইউটিআই মনে করে রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন।

যাদের বার বার ইউটিআই হয় তাদের মূত্রতন্ত্রের গঠনগত কোন সমস্যা আছে কিনা তা দেখে নেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও মূত্রতন্ত্রের কোথাও পাথর আছে কিনা সেটা জানাও জরুরী। মেনপজ বা স্থায়ী ঋতু বন্ধ হলে এস্ট্রোজেন হরমোনের অভাবে যোনিপথ ও মূত্রতন্ত্রের স্বাভাবিক সুরক্ষা কমে যায়। পানি খাওযার পরিমাণও হ্রাস পায়। তাছাড়া বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকার কারণেও মেনপজ পরবর্তী নারীদের বার বার ইউটিআই হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী কোন অসুখের জন্য স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।

প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে ঘনঘন প্রস্র্রাবের বেগ, তাড়না, মূত্রনালীতে জ্বালা, তলপেটে অস্বস্তি থেকে শুরু করে প্রচ- ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়া প্রস্রাব ঘোলা হতে পারে অথবা প্রস্র্রাবে রক্তও যেতে পারে। চিকিৎসা সঠিক সময়ে না হলে মূত্রতন্ত্রের উপরি অংশে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তখন রোগীর কাঁপানো জ্বর এবং কোমরে ব্যথার উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ অবস্থা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।

ইউটিআই বা প্রস্র্রাবে জীবাণু সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রস্র্রাব পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে।

বার বার প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণরোধে করণীয় হলো :

ক. প্রস্র্রাবের বেগ চেপে না রেখে প্রস্র্রাব করে ফেলতে হবে।

খ. প্রস্র্রাব করার পর টয়লেট পেপার দিয়ে চেপে মুছতে হবে, কখন্র ঘষবেন না এবং পায়খানার রাস্তা থেকে প্রস্র্রাবের রাস্তার দিকে কখনও মুছবেন না।

গ. পরিমিত পানি পান করতে হবে। গরমের সময় শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে কয়েক গ্লাস পানি বেশি খেতে হবে। এ ক্ষেত্রে লেবুর শরবত, অন্যান্য ফলের রস, ডাব ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

ঘ. কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলতে হবে। যাদের এ সমস্যা রয়েছে তারা প্রচুর পানি পানের পাশাপাশি আঁশযুক্ত খাবার যেমন, শাক-সব্জি, সালাদ, ফল, ইসবগুলের ভুসি ইত্যাদি বেশি করে খাবেন। তবে ইসবগুলের ভুসি ভিজিয়ে না রেখে সাথে সাথে খাবেন।

ঙ. গরমের দিনে তাজা দই খেতে পারেন।

চ. যৌনমিলনের আগে পানি খেয়ে নিন এবং আগে ও পরে প্রস্র্রাব করে পরিষ্কার হয়ে নেবেন।

ছ. যৌনমিলনে শুষ্কতা এড়াতে কে-ওয়াই জেলি ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুক্রাণু নাশক কোন ওষুধ ব্যবহার করবেন না।

জ. মাসিক বা রজঃস্রাবের সময় যৌনমিলন করবেন না। ইউটিআই প্রতিরোধের পাশাপশি তা যৌনবাহিত রোগ এড়াতে সহায়ক হবে।

ঝ. যাদের মেনপজ হয়ে গেছে তাদের বার বার ইউটিআই বা প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যোনিপথে এবং মূত্রনালীর মুখে এস্ট্রোজেন ক্রিম ব্যবহার করতে হতে পারে।

ঞ. রিকারেন্ট ইউটিআই-এর ক্ষেত্রে স্বল্প মাত্রায় দীর্ঘদিন এ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হতে পারে।

পোষ্টটা কেমন লেগেছে সংক্ষেপে কমেন্টেস করে জানাবেন৷ T= (Thanks) V= (Very good) E= (Excellent) আপনাদের কমেন্ট দেখলে আমরা ভালো পোষ্ট দিতে উৎসাহ পাই।

Check Also

পাঁকা পেঁপে খাওয়ার ১০টি উপকারিতা

বিশ্বের জনপ্রিয় ফলগুলোর মধ্যে একটি পেঁপে। স্বাদ ও গুনাগুণের কারণেই মানুষের কাছে এর এতো কদর। ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *