Monday , 14 October 2019

বাঙালি পরিচয়ের আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সিডনির পুজো.

দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। দশভূজা মহিয়সী, তেজস্বিনী। তাঁর রূপ,শিক্ষা,শক্তি অপরিসীম। তিনি অজেয়, অপার। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি জননী। তাঁর শুরু নেই, শেষও হয়না কখনও! অথচ আশ্বিনের এই মঙ্গল তিথিতে তিনি বারবার ফিরে ফিরে আসেন মর্ত্যধামে যাতে চারদিনের জন্য হলেও মানুষ ভুলে থাকে তাদের নিত্যনৈমিত্তিক যন্ত্রণা! সন্তানদের দুঃখ যে কখনওই কোনো মা নিজের চোখে দেখতে পারেন না!

পারিজাত ব্যানার্জী
কলকাতায় যতদিন ছিলাম,পুজোর সময় কখনও বাইরে বেড়াতে যাওয়ার আগ্রহেও মন সায় দিত না। খুব একটা মনেও পড়ে না,কোথাও গেছি বলে। সেসময় আমার দাদুদের বাড়ি ছিল পাটনায়। ওখানে এক দুবার যে যাইনি তা নয়, পুজোতে যোগও দিয়েছি হয়তো, তবে সবসময় মনে হয়েছে কলকাতার সেই ভরপুর আস্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। সারাবছরের গ্লানি, ক্লান্তি, ঘাম, মশা আর জমাজলে ধুঁকতে থাকা আমার শহর এই সময় কটা দিন যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় তার নিজস্ব অপার্থিব স্বমহিমায়।

এক অন্যরকম আলো আর আবেগ যেভাবে উপচে পরে সমস্ত গলি থেকে রাজপথ, যেভাবে আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় ও চেতনা জুড়ে বেজে ওঠে দেবী বন্দনা আর আবাহনী গান -এমন উদ্দামতার সিকিভাগও অন্য কোথাও পাওয়া যে সম্ভব, সেই ধারণাই আমার ছিল না! এ যে কেমন এক অবুঝ ঘোর লাগা, কি যে তার অভাবনীয় মূর্চ্ছনা, যে বা যারা কখনও কলকাতায় থাকেনি, বড় হয়নি, তাদের পক্ষে, মনে হত সেই উত্তেজনা অনুভব করাও সম্ভবপর নয়। আমাদের উমা যে আপাদমস্তক বাঙালী! সেই অগ্নিবর্ণা ত্রিনয়নী ঘরণীর ছেলেপিলে নিয়ে বাপের বাড়ি আসার যে আত্মিক ঘনিষ্ঠতা এবং যোগ, সেই নৈকট্য কোনোদিনই প্রবাসে কখনোই ধরা পড়তে পারে না।

বুঝিনি, আমাদের পরিচয়ের একটুকরো কণায় যতদিন লেগে থাকবে বাঙালিয়ানা, ততদিন দুর্গাপুজো থেকে আমাদের কোনো স্থান কাল পাত্রই কোনওভাবে সরিয়ে নিতে পারবে না। সিডনিতে আসার দু’বছরের মধ্যেই মর্মে মর্মে তা টের পাচ্ছি। প্রথম প্রথম যখন কাউকে চিনি না এখানে, তখনও নতুন শাড়ি পাঞ্জাবীদের হঠাত্‍ এই জটলায় এসে পড়লে বারবার মনে হয়েছে, কলকাতা কখনই আমার চারপাশ থেকে খুব একটা দূরে সরে যেতে পারে না। তিলোত্তমা যে নিজেই দুর্গার আরও এক রূপ, তাকে কোনো ঘেরাটোপে এভাবে বাঁধা যায় না।

এবছর মোট চোদ্দটি পুজো হচ্ছে সিডনিতে। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার যেই প্রান্তেই থাকুক না কেন বাঙালি, বিদেশে বসেও পুজোর রোশনাই থেকে দূরে অন্তত কাউকেই থাকতে হচ্ছে না। মেলবোর্ন, থেকে ক্যানবেরা হয়ে পার্থ — সবাই তৈরি ঘরের মেয়ের বাত্‍সরিক আবাহনের বরণে।

যেহেতু কলকাতার মতো ছুটিছাটা এখানে মেলে না, তাই সাধারণত সপ্তাহান্তে কোনো হল, বা স্কুল অডিটোরিয়াম ভাড়া নিয়ে আয়োজন করা হয় দুর্গাপুজোর। ব্যতিক্রমও অবশ্যই আছে, যেখানে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ছুটি নিয়ে পঞ্জিকা মতেই চারদিন ধরে নিষ্ঠা ভরে পুজো করে আসছেন বহু বাঙালি অনেক বছর ধরে।

সবচেয়ে যা মন টানে এইসব পুজোয়, তা হল এখানে বাংলার মধ্যেকার সমস্ত বেড়া যেন ভেঙে যায় এক নিমেষে! প্রতি বছর সিডনিতে অন্তত পাঁচ থেকে ছটি পুজোর আয়োজন করে বাংলাদেশী কিছু সংগঠন। অভিন্ন বাংলার এই চালচিত্র এমনই বর্ণনাতীত এক অনুভূতি, যা কিন্তু কলকাতায় থাকতে কখনই টের পাওয়া যায় না কিছুতেই। প্রবাস আসলে মনের জানালার ব্যাপ্তি বোধহয় বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ – সেই জানালার কখনওই কোনো গরাদ তাই আবেগে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে অন্তত কিছুতেই ধরা পড়ে না!

এইবছর দৈবক্রমে সপ্তাহান্তেই যেহেতু শুরু দুর্গাপুজো, তার উপর আবার সোমবার এন এস ডব্লিউ স্টেটে ছুটি, তাই প্রায় সব পুজো কমিটিই এই তিনদিনের মধ্যেই আয়োজনের চেষ্টা করেছে তাদের উত্‍সবের। সাধারণত চারদিনের পুজো একদিন বা দুদিনেই বেঁধে ফেলা হয়। কলকাতা থেকে আনানো হয় প্রতিমা। পুজোর পর মুর্তি ভাসানের চল এখানে নেই। বরং তা সযত্নে তুলে রাখা হয় কারও বাড়িতে আবার পরের বছর পুজো করার বাসনায়।

এমনকি, এখানেই প্রথম আলাপ হল পার্থদার মতো এমন এক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, যিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজের হাতেই গড়ে ফেলেছেন সুবিশাল এক অসামান্য সুন্দর প্রতিমা! রোজকার সংসার, চাকরির একঘেয়ে জীবনকে ফুত্‍কারে এভাবে উড়িয়ে সত্তরোর্ধ এক মানুষ যে আবার নবীন জীবনীসুধা পান করতে পারেন অকপটে, তা বিশ্বাসই হতো না ওনার অকপটতার সঙ্গে পরিচয় না ঘটলে। প্যাণ্ডেল ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখাতেই যে সীমাবদ্ধ নয় বাঙালিদের উপচার, তার জীবন্ত প্রমাণ এইসব প্রবাসী প্রবীণেরা।

এখানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছোটদের তেমন ভাবে হয়তো কলকাতা বা বাংলাকে চেনা বোঝা বলার সুযোগ হয় না সবসময়। উত্‍সবের কটা দিন তাদেরও Aussie চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসার একটা সুযোগ অন্তত করে দেয় এই আরাধনা। দুর্গা কি, কেনই বা তিনি মহিষমর্দিনী, সেই গল্পেই না হয় হোক তাদের কাছে বাংলার প্রথম সহজ পাঠ, ক্ষতি কি?

‘সহজ পাঠ’ এর সূত্রে মনে পড়ল, এত দূরে বাংলা সাহিত্যকে ছড়িয়ে দিতে ও শারদীয়ায় পূজাবার্ষিকীর ঘ্রাণ থেকে বাঙালিদের বঞ্চিত না করতে দুই বাংলার মানুষদের সুতীব্র ইচ্ছায় শ্রীমন্তদার বাড়ির বাংলা লাইব্রেরিতে গড়ে উঠেছে ‘আনন্দধারা’র খোলা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কিছু হুজুগে বাঙালির কাঁধে ভর দিয়ে অনেক গল্পই নিজেদের হাতে লিখে গেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে সুবোধ সরকার হয়ে শ্রীজাতও। প্রতি বছর পুজো আঙ্গনে তাঁদের শারদীয়ার স্টল’ পুজো পুজো গন্ধ’ কে সত্যাসত্য কিন্তু বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ!

এমন অনেক রত্নই ছড়িয়েছিটিয়ে পাওয়া যায় অবশ্য এই সিডনির বুকে যা খোঁজার একমাত্র উপায় এই পুজোর সম্মিলনীগুলি। অফিসের কোনো বড়কর্তা যেখানে অনায়াসেই নামাবলী চড়িয়ে পুরোহিতের আসন অধিগ্রহণ করেন, প্রতিদিন স্কুল কলেজের এবং কাজের পর রিহার্সাল দিয়ে তৈরি হয় সব উপস্থাপকেরা তাদের পরিবেশনাকে সকলের সামনে তুলে ধরতে।

স্কুল ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানো,লাইট আর বাদবাকি ইলেকট্রিক্যাল কাজকর্ম, ফল কাটা থেকে প্রসাদ ও ভোগের আয়োজন করা ছাড়াও দুবেলা সব্বাইকে খাওয়ানোদাওয়ানোর যে অঢেল এলাহি ব্যবস্থা হয়ে থাকে এই পুজোকে কেন্দ্র করে, এক বিশাল সংখ্যক বাঙালি সেই ভার নেপথ্যে থেকে না তুলে নিলে, কখনওই বোধহয় এতকিছু সম্ভব হতো না! মাদুর্গাও আসতে দ্বিধাবোধ করতেন তখন সুদূর এই প্রবাসে।

এখানে এখন বসন্তকাল।দেবী তাই হয়তো এখানে বাসন্তী রূপেই পূজা পান। সেই হিসাবে দুর্গাপুজোকে ‘অকালবোধন’ ও হয়তো বা বলা যাবে না দক্ষিণ গোলার্ধের এই বিস্তীর্ণ দ্বীপে। মা তবু সারা পৃথিবীর সঙ্গে একই সময়ে আসেন ফিরে ফিরে বাঙালিদের মনোজোয়ারে আরেক বার ভেসে যাওয়ার তাড়নায়। মর্ত্যবাসী সমস্ত রমণীদের একসাথে কাছে টেনে নিয়ে মেতে ওঠেন আবার সিঁদুরে খেলায়!

কলকাতার আমেজটুকু পুরোটা তাই নাই বা মিলল, তবু উদযাপনে উত্‍সবে মেতে থাকতে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না কখনও দেশ বা সময়। পুজো, ভক্তি, ঈশ্বর আর কোলাহল — সবই যে বাঙালি রাখে তাদের বুকপকেটে, প্রয়োজন মতো ব্যবহার করার তাগিদের অনিবার্যতায়!

Check Also

পাখির মল বা বিষ্ঠায় থাকে ষাটেরও বেশি ঘাতক রোগ-জীবানু! দাবি বিজ্ঞানীদের

অনেকেই আছেন যাঁরা শখ করে বাড়িতে পাখি পোষেন। এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয় যাঁরা পাখির ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *