অটিস্টিক শিশুর অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস রোধে করণীয়

অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ প্রবণতা বা Over Eating Habit তূলনামুলকভাবে কম দেখা যায়। তবে কিছু কিছু অটিস্টিক শিশুর মধ্যে সারাদিনই কিছু না কিছু খাবার প্রবণতা দেখা যায় বা খাবারের সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের বাতিক দেখা যায়।

শিশুর অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের ইস্যুটি বোঝার জন্যে তার খাদ্যাভ্যাসের প্রতি মনযোগী হলেই বাবা-মা হিসেবে আপনি বুঝতে পারবেন, কেন সে বেশি খেতে চাচ্ছে। তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, সে কি সুনির্দিষ্ট কোন ফুড আইটেম দেখলেই বেশি খাচ্ছে নাকি সহজাত অভ্যাসের বশে বেশি খাচ্ছে।

পাশাপাশি আপনি একজন পেডিয়াট্রিশিয়ানের সঙ্গেও এ ব্যাপারে আলোচনা করে দেখুন যে এর পেছনে কোনো মেডিক্যাল কারণ আছে কিনা। পেডিয়াট্রিশিয়ানের নিরীক্ষার পর যদি কোন Medical Reason না পাওয়া যায় তবে আপনার শিশুটি হয়তো নিম্নের যে কোনো কারণে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করছে।

Habit বা অভ্যাস- আপনার সন্তানের খাবার গ্রহণের প্যাটার্ন কয়েকদিন ধরে নোট করুন। এতে আপনি তার খাদ্যাভ্যাসের ধরণটা বুঝতে পারবেন; সে কি কোন সুনির্দিষ্ট সময়েই খাচ্ছে নাকি যখন টিভি দেখতে থাকে নাকি কম্পিউটার এ কিছু দেখার সময় নাকি যখন সে কোনো কিছু করার মতো কাজ পায় না নাকি নির্দিষ্ট কোনো খাবার পেলেই অমন করে, ইত্যাদি।

Obsessive Compulsive Behaviour- এটি একটি মানসিক ব্যাধি (ডিজঅর্ডার)। এ সময়ে ব্যক্তিটি একই ধরণের আচরণ ক্রমাগত বারবার করতে থাকে। এটি তার আচরণকেন্দ্রিকও হতে পারে আবার চিন্তা বা ভাবনাকেন্দ্রিকও হতে পারে। আপনার শিশু অতিরিক্ত খেলে (Overeating) বুঝার চেষ্টা করুন, সে কি কোনো অভ্যাসের কারণে অমন করছে নাকি কোনো সুনির্দিষ্ট খাবার পেলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খেতেই থাকে? যদি সে খাবারের সময় অতিরিক্ত খাবার খায় এবং ক্রমাগত খাবার খেতেই থাকে তবে তা কমপালসিভ বিহেভিয়ারের আওতায় পড়ে।

Medication side effects বা ঔষধের পার্শপ্রতিক্রিয়া- আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী কিছু কিছু ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবেও অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরণের কিছু ঔষধ রুচি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে শরীরের খাদ্যগ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে।

Unpredictable mealtimes বা সময়বহির্ভূত খাদ্যাভ্যাস- যদি আপনার শিশুর খাবার গ্রহণের সময় রুটিন ভিত্তিক না হয়, তবে সে সারাদিনই এটা-ওটা খেতে থাকবে এবং তার ওভারইটিংয়ের অভ্যাস তৈরি হবে।

Sensory sensitivities বা স্নায়বিক অনুভূতি সংক্রান্ত- এ ব্যাপারটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। আপনার শিশুটি যদি Soft Texture পছন্দ করে, তবে সে soft foods পছন্দ করবে বা সেগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হবে। আবার নির্দিষ্ট কোনো রঙের খাবার পছন্দ করলে তার নিয়মিত খাবারের মধ্যে সে বর্ণের খাবার রান্না করে দিন।

সার্বিক বিবেচনায় যদি আপনার মনে হয় যে আপনার শিশুটি Obsessions (ঘোর বা আসক্তি) এর জন্যে ওভারইটিং করছে, তাহলে খাবারের সময়গুলোতে শিশুটির প্লেটে বা টেবিলে বা তার চোখের সামনে খাবারের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিন।

যদি নিশ্চিত হন যে, মেডিকেশনের (ঔষধের) জন্যে আপনার শিশু এমন করছে, সেক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং সম্ভব হলে ঔষধ পরিবর্তন করিয়ে নিন। এসময় Trial and Error পদ্ধতিতে আপনার শিশুর জন্যে সবচেয়ে উপযোগী ঔষধটি নির্দিষ্ট করে নিতে হবে।

অটিস্টিক শিশুরা সময় ভিত্তিক রুটিন খুব পছন্দ করে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পরিমানে খাবার গ্রহণের অভ্যাস করানোর জন্যে সময় ধরে অর্থাৎ রুটিন সময়ের চর্চা করাতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয় এবং তারা রুটিনের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করে। যখন শিশুটি খাবারের রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, তখন তার জন্যে লো ফ্যাট এবং লো এনার্জি মেন্যু প্ল্যান করুন।

আপনার শিশুকে ক্ষুধা লাগা এবং ভরা পেট- এ দুটো বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনি তাকে খাওয়ানোর সময় সে যদি খেতে না চায়, তখন তাকে জোর করবেন না বরং অপেক্ষা করুন যাতে সে ক্ষুধা বোধ করে নিজে খেতে চায়। আবার তাকে খাবার খাওয়ানো শেষ করার পর যদি সে আরো খেতে চায়, তখন একটু অপেক্ষা করে দেখতে পারেন এবং বোঝার চেষ্টা করুন সে কি সত্যিই খেতে চাচ্ছে নাকে খাওয়ার যে আগ্রহ দেখাচ্ছে তা তার ‘চোখের ক্ষুধা’।

কিছু শিশু মনে করে তারা ক্ষুধার্ত, কিন্তু আসলে তারা তৃষ্ণার্ত। সে তৃষ্ণা বা ক্ষুধার পার্থক্য বুঝতে পারছে না বলে তখন পানি না খেয়ে অন্য খাবার খেতে চাচ্ছে। এজন্যে আপনার শিশুটি যেন সারাদিনে যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করে, বিশেষ করে খাবার সময়গুলোর মধ্যবর্তী সময়গুলোতে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

যদি এমন হয় যে আপনার শিশুটি বোরিং ফিল করলে এটা ওটা খাচ্ছে, তাহলে শিশুটিকে ব্যস্ত রাখার জন্যে একটিভিটি প্ল্যান করে রাখুন এবং পরবর্তী খাবার গ্রহণের সময় (Meal Time) পর্যন্ত তাকে ব্যস্ত রাখুন। মাঝের সময়টায় সে যে সকল একটিভিটি পছন্দ করে সেগুলো দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখুন।

হালকা খাবার বা স্ন্যাক্স জাতীয় খাবারগুলো আপনার শিশুর হাতের নাগালের বাইরে রাখুন এবং প্রয়োজনে চোখের আড়ালে রাখুন। অনেক সময় হাতে কোনো কাজ না থাকায় বা কি করা যায় বা একটা কিছু করি- এ ধরণের ভাবনা থেকেও শিশুরা লাগাতার এটা ওটা খেতে থাকে।

আপনার শিশুটিকে প্রতিদিন কিছু ফিজিক্যাল একটিভিটি করান। তাকে কিছু দৌড়াদৌড়ি বা ছুটাছুটি করার সুযোগ দিন। এতে তার ব্যস্ততা বাড়বে, গৃহীত খাবার হজম হবে, একঘেয়েমিও কাটবে। শুরুতেই বলেছি যে, অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে বেশি খাওয়ার (Overeating) প্রবণতা কম দেখা যায়। মনে রাখবেন, সকল অটিস্টিক শিশু স্বীয় ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আলাদা। তাই একই পদ্ধতি অবলম্বন করে একাধিক শিশুর ক্ষেত্রে ফলাফল আশা করা উচিত নয়। আপনার শিশুর পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনায় তার ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করাই বাঞ্ছনীয়। আপনি আপনার শিশুর ব্যাপারে যতো পর্যবেক্ষণশীল হবেন, ততোই তার ব্যবস্থাপনা আপনার জন্যে সহজতর হবে।

পোষ্টটা কেমন লেগেছে সংক্ষেপে কমেন্টেস করে জানাবেন৷ T= (Thanks) V= (Very good) E= (Excellent) আপনাদের কমেন্ট দেখলে আমরা ভালো পোষ্ট দিতে উৎসাহ পাই।

Check Also

সাদা না লাল, জানেন কোন ডিম বেশি পুষ্টিকর?

আট থেকে আশি— ডিম প্রায় প্রতি দিনই সব বাড়িতে কম-বেশি আনা হয়। বাড়িতে ছোট শিশু ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *